27 Nov 2020

IELTS এর আদ্যোপান্ত

আমরা সবাই IELTS সম্পর্কে শুনেছি। কিন্তু আমরা কি জানি IELTS  কী এবং কেন এটি আমাদের প্রয়োজন? 

IELTS  এর সম্পূর্ণরূপ  International English Language Testing System । নাম শুনেই আমরা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছি, ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা যাচাইয়ের জন্য IELTS পরীক্ষা দিতে হয়। আপনার প্রথম ভাষা বা মাতৃভাষা যদি ইংরেজি না হয়, সেক্ষেত্রে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের উদ্দেশ্যে বিদেশ গমণে, দেশের বাইরে চাকরি করতে কিংবা স্কিলড মাইগ্রেশন এর জন্য  IELTS এর ভালো Band Score খুবই প্রয়োজন।

ইউনিভার্সিটি অব ক্যামব্রিজ, ব্রিটিশ কাউন্সিল ও আইডিপি অস্ট্রেলিয়া যৌথভাবে পরিচালনা করে IELTS পরীক্ষা। এ পরীক্ষায় নীতি নির্ধারক কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় হলেও বিশ্বব্যাপী পরীক্ষা পরিচালনা ও শিক্ষার্থীদের কাছে তথ্য পৌছে দেওয়ার মূল ভূমিকা পালন করছে বিট্রিশ কাউন্সিল ও আইডিপি অস্ট্রেলিয়া। সারা বিশ্বে একই প্রশ্নপত্র ও অভিন্ন নিয়মে পরিচালিত হয়। ব্রিটিশ কাউন্সিলের তত্ত্বাবধানে প্রতি মাসে তিনবার করে বছরে ৩৬ বার আইইএলটিএস পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়।

পরীক্ষা পদ্ধতি 

IELTS পরীক্ষা দুই ধরণের হয় – Academic Category ও General Category  । 

Academic Category:  

যারা উচ্চশিক্ষা গ্রহণে দেশের বাইরে আবেদন করতে ইচ্ছুক তাঁদের মূলত এই ক্যাটাগরীতে পরীক্ষা দিতে হয়। বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি নির্দিষ্ট মানদন্ডের ভিত্তিতে ভর্তির আবেদনের জন্য IELTS এর সর্বনিম্ন একটি Band Score লাভের শর্ত জুড়ে দেয়া হয়।   

General Category :

যারা বিভিন্ন ট্রেইনিং বা কারিগরী কার্যক্রমে অংশগ্রহণের জন্য, কিংবা চাকরির জন্য অস্ট্রেলিয়া, কানাডা কিংবা যুক্তরাষ্ট্রে মাইগ্রেশন করতে আগ্রহী, তাঁদের জন্য রয়েছে জেনারেল ক্যাটাগরী। 

তাই ভালোভাবে জানা প্রয়োজন আপনার জন্য কোন ক্যাটাগরীটি উপযোগী। তবে উভয় ক্যাটাগরীতেই ভাষা দক্ষতা যাচাইয়ের জন্য চারটি ধাপে পরীক্ষা হয়ে থাকে – লিসেনিং, রিডিং, রাইটিং ও স্পিকিং। উভয় ক্যাটাগরীর পরীক্ষা পদ্ধতিতে পার্থক্য খুবই সামান্য। 

লিসেনিং (Listening)

লিসেনিং- নামেই বোঝা যায়, এই ধাপটিতে পরীক্ষার্থীর ইংরেজি ভাষার শ্রবণদক্ষতা যাচাই করা হয়। IELTS  পরীক্ষার এই প্রথম ধাপে কথোপকথন শুনে আপনার বোঝার ক্ষমতা যাচাই করা হয়। মোট চারটি বিভাগে ৪০টি প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়। প্রতি বিভাগের জন্য একটি করে অডিও রেকর্ডিং শোনানো হয়। ৩০ মিনিটের পরীক্ষায় প্রশ্ন ও উত্তরপত্র হাতে দেয়ার পর আপনাকে পুরো প্রশ্ন পড়ার জন্য ৫মিনিট সময় দেয়া হয়। এতে শূণ্যস্থান পূরণ, মানচিত্র পূরণ, সঠিক উত্তর নির্বাচন, এই ধরণের প্রশ্ন থাকতে পারে। এরপর অডিও রেকর্ডিং গুলো ধাপে ধাপে শোনানো হয়। শোনার সাথে সাথেই প্রশ্নপত্র অনুযায়ী সঠিক উত্তরটি লিখে নিতে হয়। এইক্ষেত্রে আপনি এক সেকেন্ডও দেরি করতে পারবেন না, নতুবা উত্তর মিস করে যেতে পারেন। একটি অডিও একবারই শোনানো হয়। চারটি অডিও শোনানোর পর আপনাকে ১০ মিনিট সময় দেয়া হবে উত্তরগুলো প্রশ্নপত্র হতে উত্তরপত্রে তুলে নেয়ার জন্য। এক্ষেত্রে আপনি পেন্সিল বা কলম ব্যবহার করতে পারেন, তবে IELTS পরীক্ষায় পেন্সিল ব্যবহার করার সুবিধা হলো কাটাকাটি হয়না, যার ফলে উত্তরপত্র পরিচ্ছন্ন থাকে যেটা খুবই জরুরী। 

রিডিং (Reading)

IELTS  পরীক্ষার ২য় ধাপ রিডিং, অর্থাৎ আপনি ইংরেজি ভাষা পড়ে কতটুকু বুঝতে পারেন তা যাচাই করা হয় এই ধাপে।  এক ঘন্টার এই পরীক্ষায় আপনাকে তিনটি বিভাগে মোট ৪০টি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। প্রতিটি বিভাগে একটি করে মোটামুটি বড় প্যারাগ্রাফ দেয়া থাকে , যেগুলো পড়ে সাধারণ সহজ কিছু প্রশ্নের উত্তর প্রদান করতে হয়। তবে প্যারাগ্রাফ থেকে সরাসরি এই উত্তরগুলো পাওয়া যায়না, ভালোভাবে প্যারাগ্রাফ পড়ে, বুঝে কৌশলে উত্তর বের করে নিতে হয় এবং এটাই এই ধাপের লক্ষ্য। সাধারণত একটি বিভাগের উত্তর করতে করতে অন্য বিভাগগুলোর জন্য সময়ের ঘাটতি পড়ে যায়, ফলে ভালোভাবে সকল বিভাগের উত্তর বুঝে সময় নিয়ে দেয়া সম্ভব হয়না। তাই আমাদের আগে থেকেই এই অংশের জন্য বারবার অনুশীলন করতে হবে, সেইসাথে বেশকিছু কৌশল রপ্ত করতে হবে যেটার জন্য আপনি এক্সপার্টদের সাহায্য নিতে পারেন কিংবা অনলাইনে অনুশীলন করতে পারেন। পড়ার সময় প্যারাগ্রাফের গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো দাগিয়ে নিন, যাতে উত্তর করার সময় সময় সাশ্রয় হয়।

রাইটিং (Writing)

IELTS  পরীক্ষার ৩য় ধাপ হলো রাইটিং যেখানে আপনার কল্পনাশক্তি ও ইংরেজি ভাষায় আপনার লেখার দক্ষতা যাচাই করে নেয়া হয়। নির্ধারিত এক ঘন্টা সময়ে আপনাকে দুটি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে এবং ২য় প্রশ্নে ১ম প্রশ্নের দ্বিগুণ নাম্বার থাকে এটা মাথায় রাখতে হবে। প্রথম প্রশ্নে আপনাকে একটি ডায়াগ্রাম বা চার্ট দেয়া থাকবে এবং সেই চার্টের ভিত্তিতে আপনাকে চার্টের মধ্যকার বিষয়গুলো কমপক্ষে ১৫০ শব্দের মধ্যে সুন্দরভাবে বিশ্লেষণ করতে হবে। দ্বিতীয় প্রশ্নে আপনার কাছে কোনো পরিস্থিতি বা বিষয় সম্পর্কে পক্ষে-বিপক্ষে মতামত ও যুক্তিবিশ্লেষণ জানতে চাওয়া হবে  এবং সেটা আপনাকে লিখতে হবে কমপক্ষে ২৫০ শব্দ ব্যবহার করে। মনে রাখবেন, এই ধাপে আপনি শব্দচয়নে যত ভিন্নতা আনতে পারবেন, আপনার ভালো নাম্বার পাওয়ার আশা ততটাই বেড়ে যাবে। তবে গ্রামার এবং বানানে যাতে কোনো ভুল না হয় – সেদিকে অবশ্যই কড়া নজর রাখতে হবে। শব্দসংখ্যা বেশি হলেও সমস্যা নেই কিন্তু চেষ্টা করবেন তাড়াহুড়ো না করে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শেষ করতে। 

স্পিকিং (Speaking)

IELTS পরীক্ষার সর্বশেষ ধাপ হলো স্পিকিং। আপনি ইংরেজিতে যেকোনো পরিস্থিতিতে কতটা সাবলীল ও শুদ্ধভাবে কথা বলতে পারেন তা যাচাই করা হবে। এ ধাপে কোনোকিছু লিখতে হয়না। প্রতিটি পরীক্ষার্থীকে একটি নির্দিষ্ট দিন দেয়া হয় এই টেস্টের জন্য। পরীক্ষকের সামনে গিয়ে বসার পর কুশল বিনিময় শেষে তাঁরা আপনাকে ইংরেজি ভাষায় কিছু প্রশ্ন করবেন এবং আপনাকে সহজ ও সাবলীলভাবে সেগুলোর উত্তর দিতে হবে। স্পিকিং টেস্টে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আপনাকে কথা বলার সময় পরীক্ষকের সাথে আই কনট্যাক্ট অর্থাৎ তাঁর দিকে তাকিয়ে কথা বলতে হবে, নার্ভাস হয়ে এদিক-সেদিক তাকাবেন না। এজন্য বাসায় আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কিংবা বন্ধুদের সাথে আগে থেকেই অনুশীলন করে নিবেন যাতে পরীক্ষকের সামনে স্বাভাবিক থাকতে পারেন। স্পিকিং টেস্টে শারীরিক ও মানসিক অঙ্গভঙ্গি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মোটামুটি ১১-১৫ মিনিটের একটি কথোপকথন হয়ে থাকে পরীক্ষক ও পরীক্ষার্থীর মধ্যে। যেখানে আপনাকে প্রথম অংশে সাধারণ কিছু প্রশ্ন করা হবে আপনার পরিবার, বন্ধু, শখ দৈনন্দিন জীবন ইত্যাদি নিয়ে। প্রশ্নকর্তা প্রশ্ন করার সাথে সাথে আপনাকে এগুলোর উত্তর দিতে হবে। অপ্রাসঙ্গিক কথা না বলে যথাযথ উত্তরটি দিবেন। ২য় অংশে আপনাকে একটি নির্দিষ্ট বিষয় দেয়া হবে এবং তা নিয়ে চিন্তা করার জন্য ১ মিনিট সময় দেয়া হবে। আপনি চাইলে মনে মনে ভাবতে পারেন, অথবা কিছু গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট আপনাকে দেয়া কাগজে টুকে রাখতে পারেন। ১ মিনিট পর পরীক্ষক আপনাকে সেই বিষয়টি সম্পর্কে কিছু প্রশ্ন করবেন এবং আপনাকে তাঁর উত্তর দিতে হবে। তৃতীয় অংশে পরীক্ষকের সাথে নির্দিষ্ট কোনো একটি বিষয়ে আপনাকে কথোপকথন চালিয়ে যেতে হয়। 

IELTS পরীক্ষার স্কোর পদ্ধতি 

IELTS এর স্কোর প্রদান করা হয় ১ হতে ৯ এর স্কেলে । পরীক্ষার চারটি ধাপে পৃথক ব্যান্ড স্কোর প্রদান করা হয় এবং সেগুলোর গড় করে সম্পূর্ণ একটি স্কোর দেয়া হয়। IELTS পরীক্ষায় কৃতকার্য বা অকৃতকার্য হওয়ার মতো বিষয় নেই। পরীক্ষার্থীরা কাঙ্ক্ষিত স্কোর তোলার জন্য চেষ্টা করে। কাঙ্ক্ষিত স্কোর না পেলে দ্বিতীয়বার এই পরীক্ষা দেয়া যায়। ভালো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে সাধারণত ৬-৭ ব্যান্ড স্কোর যথেষ্ট। তবে কিছু বিশ্ববিদ্যালয় প্রতি ধাপে আলাদা ব্যান্ড স্কোর এর শর্ত জুড়ে দেয়। তাই একটি ধাপে স্কোর কমে গেলে সেক্ষেত্রে আপনি ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য আবেদন করতে পারবেন না। 

এখন দেখা যাক স্কোরের মাধ্যমে আপনার ইংরেজি দক্ষতা কীভাবে যাচাই করা হয়।

  • ব্যান্ড ৯- দক্ষ ব্যবহারকারী
  • ব্যান্ড ৮- খুব ভালো ব্যবহারকারী
  • ব্যান্ড ৭- ভালো ব্যবহারকারী
  • ব্যান্ড ৬- পর্যাপ্ত ব্যবহারকারী
  • ব্যান্ড ৫- পরিমিত ব্যবহারকারী
  • ব্যান্ড ৪- সীমিত ব্যবহারকারী
  • ব্যান্ড ৩- অতিরিক্তমাত্রায় সীমিত ব্যবহারকারী
  • ব্যান্ড ২- ব্যবহারকারী নয়
  • ব্যান্ড ১- যারা অপ্রাসঙ্গিক উত্তর দিয়েছে বা কমিউনিকেট করতে ব্যর্থ হয়েছে
  • ব্যান্ড ০- পরীক্ষায় অংশগ্রহন করেনি বা উত্তর দেয়নি 

মনে রাখতে হবে,  IELTS পরীক্ষার ব্যান্ড স্কোরের মেয়াদ থাকে ২ বছর, অর্থাৎ কোথাও আবেদন করতে হলে আপনাকে এই সময়ের মধ্যেই আবেদন করতে হবে। মেয়াদ শেষ হওয়ার পর আবার পরীক্ষা দিয়ে কাঙ্ক্ষিত স্কোর পেতে হবে। আপনি যদি প্রাপ্ত স্কোরে সন্তুষ্ট না থাকেন, তবে চাইলে পরবর্তীতে আবার পরীক্ষা দিতে পারেন। কোন পরীক্ষার্থীর ফলাফলে সন্দেহ থাকলে ফলাফল প্রকাশের ছয় সপ্তাহের মধ্যে ‘এনকুয়ারি অন রেজাল্ট’ এর জন্য আবেদন করা যায়। এটা করতে অবশ্য নির্দিষ্ট ফি প্রদান করতে হয়। তবে ফলাফলে ভুল ধরা পড়লে ওই টাকা ফেরত পাওয়া যায় এবং ৬ থেকে ৮ সপ্তাহের মধ্যেই ব্রিটিশ কাউন্সিল থেকে পুনঃনম্বরকৃত ফলাফল প্রকাশ করে শিক্ষার্থীকে সেটা জানিয়ে দেয়।

সাধারণত আইইএলটিএস এর ফল প্রকাশিত হয় পরীক্ষার ১৩ দিন পর। ব্রিটিশ কাউন্সিল এর ওয়েবসাইট থেকে পরীক্ষার্থীর নম্বর, পাসপোর্ট নম্বর, জন্মতারিখ ও পরীক্ষা প্রদানের তারিখ দিয়ে সহজেই জানা যায় IELTS পরীক্ষার ফলাফল। তাছাড়া ব্রিটিশ কাউন্সিল থেকে সরাসরিও ফলাফল সংগ্রহ করা যায়। 

2 thoughts on “IELTS এর আদ্যোপান্ত”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *